[ চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ]
“ যাবেন? আইস ফ্যাক্টরী রোড, কলেজিয়েট স্কুল?” “ যাব।” “কত?” থতমত খাই। এইদিনও তো মনে হয়, বাসা থেকে ১০টাকায় যেতাম। মনটাকে একটু পিছনে ফেরাই। এসএসসি পরীক্ষার পরও আট বছর হয়ে গেল । সময় এভাবে পালিয়ে যায় কেন? বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায়।
রিক্সায় দুলতে দুলতে স্কুলের কথা মনে করতে চেষ্টা করি। শুনেছি, স্মৃতির রঙ্গিন কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকালে সবকিছুই মনোরম লাগে। এসব মিষ্টি গন্ধময় স্মৃতিরা এসে চেপে ধরে আমাকে। আমাদের পৌনে দুইশ বছরের পুরানো লাল ইটের স্কুল জীবনের স্মৃতি, আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা পাঁচ বছরের স্মৃতি—শুধু এইটুকু বুকে নিয়েই সারাজীবন বেঁচে থাকা যায়।
ডে-শিফটে ছিলাম আমি ; আধঘন্টার টিফিন-ছুটিটায় দোতলার করিডোরের দুইদিকের দুই দরজাকে গোলপোস্ট বানিয়ে টেনিসবল দিয়ে শুরু হত ফুটবল। বিশ-পঁচিশ জন উদীয়মান ফুটবলারের পায়ের ফাঁকে হারিয়ে যেত ছোট বলটা। কিন্তু, বালকগণের উৎসাহের কমতি ছিল না এতটুকু। কোনদিন ল্যাবরেটরির পেছনের মাঠে দেয়াল টপকিয়ে গিয়ে শুরু করে দিতাম শর্টপিচ ক্রিকেট। আবার কোন কোন দিন সুয্যিমামাকে কোনরকম পাত্তা না দিয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচ খেলার জন্য বড় মাঠটায় দাপিয়ে বেড়াতাম। ক্লাসে যখন আসতাম, তখন টপটপ করে সবার কপাল দিয়ে ঘাম পড়ছে, পিঠের দিকটা ভিজে চুপসে আছে সবার। বৃষ্টির দিনগুলো তো ষোলআনা আনন্দ নিয়ে আসত এই ত্রিশ মিনিটে। আমাদের সাদা শার্ট আর সাদা প্যান্টের ইউনিফর্মটা এই কাদামাখা মাঠে আমাদের আনন্দের সাক্ষী হয়ে থাকত বিচিত্র সব দাগের সাথে। আর, টিফিনের ফাঁকে বস্তা আইসক্রীম, মমিন ভাই-এর চটপটি, হিমালয় গ্লাস আইসক্রীম এর কথাতো এমনিতেই আসে। দু’টাকা- পাঁচ টাকার এসব চটপটি-আইসক্রিমের স্বাদ এখনো যেন মুখে লেগে আছে।
এখনো বাতাসে কান পাতলে ক্লাসের হইচই এর শব্দ শুনতে পাই। মাঝে মাঝে পাশের রেলস্টেশন থেকে ট্রেনের শব্দ-ও যেন ভেসে আসে। আর, স্কুল ছুটির পর বিশাল শব্দ করে ক্লাসরুম থেকে সবার বের হয়ে আসা— এসব সারাজীবন মিস করব।
এখন সবচে বেশি মনে পড়ে- স্যারদের ‘বেত্রাঘাত’। অঙ্ক,বাংলা,বিজ্ঞান,সমাজ,ইংরেজি যে পড়াই ভুলে যায়না কেন, শাস্তি একটাই- সেটা হলো মার। একেক স্যার-ম্যাডামের ছিল শাস্তি দেয়ারও ছিল একেক স্টাইল। এখন বুঝি, এসব শাসন-শাস্তি, বকাঝকার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তাঁদের ভালবাসা। একেকটা ছাত্রকে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যই তাঁদের এই নীরব শ্রম। তাঁরাই আমাদের জীবনের সমুদ্রে বাতিঘরের মত আলো দিয়ে যান দূর থেকে। আমরাই স্বার্থপরের মত ভুলে যাই সেসব। অবশ্য আমি একদিক দিয়ে সৌভাগ্যবান, ভাল ছাত্র হিসেবে সবার কাছ থেকে আদর একটু বেশিই পেয়েছি। আবছার স্যার, বোরহান স্যার, প্রদীপ স্যার, বঙ্কু স্যার, জেসমিন আপা, ডেইজি আপা, জামাল স্যার, হাফিজ স্যার, জাহিদ স্যার, মনোরঞ্জন স্যার সহ সবার আদর-স্নেহে কেটেছে স্কুলজীবন। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় রুমী আপা স্কুল থেকে তাঁর বিদায়ের দিনে বুকে টেনে নিয়ে দোয়া করেছিলেন- এসব ভুলি কি করে?
স্মৃতির পানাপুকুরে ডুব দিলে সেই কিশোরবয়সের আরো কত ভালোলাগার স্মৃতি উঠে আসে। ক্লাসরুমে যে খুব বেশি পড়ানো হত, এমন তো না। এজন্যই বইয়ের ফাঁকে তিন গোয়েন্দা,চাচা চৌধুরি,বিল্লু,পিঙ্কি,ফ্যান্টমদের আনাগোনা ছিল। টিফিন কিংবা রিক্সাভাড়ার পয়সা বাঁচিয়ে পুরোনো বইয়ের দোকানে প্রায়ই যাওয়া হত এদের চুপিচুপি ব্যাগবন্দি করতে। কিছু বই এখনো রয়ে গেছে আমার বুকশেলফের কোণায়, যেখান থেকে পাওয়া যায় স্কুলের গন্ধ । আর, স্কুল পালানোটা ছিল অনেকের কাছেই অ্যাডভেঞ্চারের মত। আবার অনেকের কাছেই নিয়মিত অভ্যেস। ক্লাস টেনে একবার দু-তিনজন বাদে ৫০-৬০ জন একসাথে পালিয়ে গেলাম। পরে কাদের স্যারের কাছে দরখাস্ত লিখে ক্ষমা চেয়ে রেহাই পেতে হয়েছিল শেষে।
আর একদিনের কথা মনে পড়ছে। ২০০২ এর ফুটবল বিশ্বকাপ চলছিল। তখন ক্লাস টেনে আমরা। স্পেন-দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কোয়ার্টার ফাইন্যাল। স্কুল টাইমেই খেলা। আমি একাই দরখাস্ত লিখে সব ক্লাস-ক্যাপ্টেন, স্যারদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে ‘হাফ ছুটি’ নিয়ে ফেললাম। ততক্ষণে অবশ্য খেলা প্রায় শেষ। কি আর করার, নিজেরাই নেমে গেলাম মাঠে ! আর, ’৯৯ এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেদিন পাকিস্তানকে হারাল, পরদিন সকাল আটটায় ছিল সমাজ পরীক্ষা। সারারাত খুশিতে কিছুই পড়া হয়নি। ভয়ে ভয়ে স্কুলে গিয়ে দেখি, হেডস্যার-ও এই আনন্দে শরিক হয়ে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন স্কুল।
স্কুল লাইফে অনেকটা সময় ধরে ক্লাসক্যাপ্টেন থাকতে হয়েছে। দায়িত্বপালনের জন্য, বিশেষ করে দশ টাকা বেতন দেয়ার দিনে দুষ্টবালকদের নাম ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে হয়েছে। নামের পাশে স্টারমার্ক দিয়ে আসামীদের আরো ভালভাবে চিহ্নিত করতাম। স্যারদের কাছে শাস্তি পেলে মনে মনে তারা আমার ঊর্ধ্বতন পুরুষসহ বংশলতিকা ধরে টানাটানি করত। টিফিনের হিসেবের খাতায় পাঁচ-সাতটা বাড়িয়ে দিয়ে তাই প্রায়দিনই এই ক্ষতিপূরণের চেষ্টা চলত আমার।
স্কুলজীবনের বন্ধুত্বটা অন্যরকমের- সময়ের সাথে সাথে বাড়ে, কখনোই কমে না। সেইসব ভালবাসার, ভালোলাগার দিনগুলোতে কত পুরোনো-নতুন গল্প-গানে মেতে উঠতাম সবাই। অর্কের সাথে মাঝে মাঝেই অভিমানে কথা বলা বন্ধ করে দিতাম। আবার কখন যে সব ভুলে গিয়ে কথা বলছি দুজন, নিজেরাই জানতাম না ! ক্লাস এইটে বৃত্তি পাবার পর তাবাসসুম, তাসিফ, রিদওয়ান, মাসুদ, মাহমুদ, রুবায়েত, হুদা- এরা একদিন ধরল স্কুল ছুটির পর।বলল- “ প্রিয়ম, তুই যে ফার্স্ট হইলি, এতে পার্থক্য কই জানিস? আমরা হলে কেবল আমরা নিজেরাই খুশি হতাম। তুই হয়েছিস বলে আমরা সবাই খুশি হয়েছি।” এত বড় প্রশংসা আর কারো কাছ থেকেই পাবো না কখনোই ! পুরো স্কুলে কয়েকশ বন্ধু আছে, আরো অনেকের হয়ত নাম নেয়া হয়নি এখানে, কিন্তু সময়ে-অসময়ে ওদের স্মৃতিগুলোই বুকে আঁকিবুকি কেটে যায়। কোনদিন হয়ত অন্য কোন স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময়, টিফিন কিংবা ছুটির ঘন্টা কানে এলে হঠাৎ এদের কথা মনে পড়ে আর একটা শ্বাস কেন যেন একটু দীর্ঘ হয়ে যায়।
সময়ের প্রজাপতি উড়ে চলে যায়। স্কুলের সাথে সম্পর্কটা চৌদ্দ বছরের। এই চৌদ্দ বছরের প্রতিদিনের হাসি- আনন্দে, কষ্টে-বিপদে, আড্ডায়,খেলায় চারপাশে ছায়া হয়ে থেকেছে বন্ধুরা। ভালোলাগার, নস্টালজিয়ার সব শব্দ, বিশেষণ বরাদ্দ থাকে এই বন্ধুদের জন্য। জানি, এদের সাথে ভুল করলেও এরা এমনিতেই আমাকে ক্ষমা করে দেয়। তাইতো কখনো রাস্তায়,বাসে,ট্রেনে দেখা হলেই, “ কিরে? কেমন আছিস?” বলে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।
বন্ধুরা, তোরা আছিস বলেই আমি আছি। তোদেরকে হাত দিয়ে ছুঁতে না পারলেও মন দিয়ে ছুঁয়ে দিই। বয়স বাড়ার সাথে শৈশব-কৈশোরের এসব বন্ধুরা হারিয়ে যায় যেন কোথায়। কিন্তু হৃদয়ের নরম ঘরে যাদের স্থান,তারা কি কখনো হারায়? জীবনের নানারকম ব্যস্ততার কারণে তোরা পাশে বসে না থাকলেও, মনের বারান্দায় ঠিকই তোরা হেঁটে বেড়াস। একদিন তোদের সঙ্গ পেয়েছি বলেই আজ নিঃসঙ্গতায় ভুগি। যেদিন আমাকে ‘তুই’ বলে ডাকার কেউ থাকবেনা, সেদিন আমিও থাকব না।
নিমজ্জিত বাংলা