অভ্রের বাসায় এসেছি কিছুক্ষন হল। প্রতিদিনের মত ওর ঘরের পড়ার টেবিলের পাশেই বসে রয়েছি। সামনের চেয়ারটা ফাঁকা। ওখানটাতেই বসতো ও। টেবিলে পড়ার বইগুলোর বদলে পড়ে রয়েছে কালচে রঙের ডায়রি। না ছুয়েও বুঝতে পারলাম ডায়রিটা ওর। অভ্রের মা দিয়ে গেছে ওটা। বলল, আমাকে দেবার কথা বলেছিল ও। নিজেই হাতেই দিত আমাকে, কিন্তু সময় পায় নি।
আস্তে করে হাতে নিলাম ডায়রিটা। এ বছরেরই। সালটা সোনালি আভায় জ্বলজ্বল করছে। ভেতরের পাতাগুলোতে চোখ বুলালাম। ও তো কখনও আত্মকেন্দ্রিক ছিল না। ডায়রি লেখার মতো সময় সে পাবে কথায়? সারাদিন ক্যাম্পাসে হৈচৈ, গলা মাতিয়ে গানের আসর, বন্ধুদের বাসায় ঢুঁ দেয়া বা লাইব্রেরির সিঁড়িতেই তো রাত নামাত। সেই অন্যান্য ভ্যাবদা ছেলেদের মতো ডাইরি লিখবে, বিশ্বাস করা কঠিন।
তবুও পড়তে লাগলাম। গোঁটা গোঁটা অক্ষরে লেখা, অনেকটা মেয়েলি ধাঁচের, তবে সুন্দর।
শুরুতে কয়েক পৃষ্ঠা কাটাকাটিতে ভরপুর। বোধহয় যা লিখতে চাচ্ছিল তা হচ্ছিল না। তারপর বলা নেই, কওয়া নেই মধ্য পাতা হতে শুরু।
গত কদিন জাবত অস্থির লাগছে। আগে জানালাটার সামনে দাঁড়ালে একটু কমত। এখন আর তা হয় না। বাইরে সবে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে, আবছা আধারে ঢেকে আসছে চারদিক। মেঘের জন্য সূর্যও ঢাকা পরেছে গত কয়েকদিন। এই আবার শুরু হল। চারদিকে তুমুল বৃষ্টি, কানে তালা ধরিয়ে দেবার মতো বিজলি চমকাচ্ছে।
জানি না কার কেমন লাগে, আমার বৃষ্টি ভাল লাগে। ভাল লাগে দু হাত দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতে। আর ভাল লাগে রানুকে। আর আমার ভাল লাগা কতোটা ক্ষণস্থায়ী, সেটা আমি জানি। জানি বলেই আমার মনটা আজ বিক্ষিপ্ত। কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা। আজ-
তারপর আবার কাটাকুটি। কি যেন লিখবে লিখবে করেও লিখতে পারছে না। আমি আবার কয়েকটা পাতা এগিয়ে যাই। আবার হঠাৎ শুরু-
আজ এসেছিল রানু। ওর কথা আগে ভাবলেই বুকের কোথাও যন্ত্রণা করে উঠত। এবার কেন যেন তা হয় নি। এসে বসেছিল ওই জানালার ধারে। দৃষ্টিতে কেন যেন সেই ছেলেমানুষি ছিল না। আমি ওর পাশে এশে বসলাম। ওর নিশ্বাসের শব্দ এতো তীব্র ভাবে পাচ্ছিলাম, মনে হয়েছিলো আমার শরীর বরফ শীতল হয়ে যাচ্ছে। আমি যেন এই জগতে নেই। ও ওর লম্বা চুলগুলো আজ খোঁপায় বাধে নি। একরাশ কাল মেঘের মতো মাথা এলিয়ে পড়ে আছে কোমর অবধি। রানু চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। আমার তখন মনে হয়েছিলো ওর কোমল চুলগুলোকে ছুয়ে দেখি। হাতদুটো ধরে বসে থাকি।
কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নেই। বিধাতা আমার সকল ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন অজানা অচেনা কোন এক কঠিন সত্যের জালে। যা হতে আমার নিস্তার নেই।
রানু আস্তে করে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল, কপাল হতে কয়েকটি চুল সরিয়ে বলল, অভ্র...আমি-
রানু কি বলবে আমি জানি। আর তাই চোখ তুলে চেয়ে চুপ করে রইলাম। রানুর চোখে দু ফোঁটা অশ্রু টলমল করছে। এই পরবে, ওই পরল অবস্থা। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলাম। দু টুকরো হীরে যেন। রানু যেন নিজেকে কোন ভাবে স্থির রেখে বলতে লাগলো, অভ্র আমাদের আর দেখা হবে না তাই না।
আমার একটি হৃদস্পন্দন যেন হারিয়ে গেল। খুব সাবধানে নিঃশ্বাস চেপে বললাম, না, আমাদের আর দেখা হবে না।
রানু ফুপিয়ে উঠল। ও ঠিকই বুঝতে পারছিল আমি কি চাই?
রানুর চোখ হতে দু ফোঁটা পানি আর নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারল না। ঝরে পরল ওর কোলে। ধীরে ধীরে হতাশায় কালো হতে শুরু করেছে ওর সুন্দর মুখখানি। কাধ দুটো নুয়ে পরেছে। আস্তে আস্তে চোখের পানি মুছে বলল,
কেন অভ্র? আমাদের সাথেই কেন হবে? আমরা তো কোন পাপ করিনি। তবুও- আর বলতে পারল না। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। টেবিলের কোনায় মাথা রেখে কাঁদতে লাগলো।
আমার তখন চীৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, রানু কেঁদো না। আমি কখনও তোমাকে একা ছাড়বো না। এই দেখ, কথা দিচ্ছি। আমি সকল বাধা জয় করবই। আমি মরব না। দেখ আমি বেঁচে থাকব। তোমার স্পর্শই আমাকে মৃত্যুর মুখ হতে ফিরিয়ে আনবে। দেখ, আমি কথা দিচ্ছি।
কিন্তু, পারলাম না। রানুকে বলতে পারলাম না। পারলাম না ওকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিতে। খুব স্বাভাবিক গলায় ওর সাথে কথা বলেছি। ওকে বলেছি, জীবন কোন ঝরা পাতার নাম নয়। জীবন এক অবিরাম ভালবাসার সঙ্গীত, গেয়ে যেতে হবে। আজ আমার পালা শেষ, কাল তোমার আসবে। তাই মিছে ভেবো না। আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি চাই নিজের জীবনকে তুমি তোমার পথে এগিয়ে নেবে। একদিন আমার মতই তোমার পথ কেউ রোধ করে দারিয়ে বলবে, রানু- তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর, যেন কোন কাজল জলের দীঘি। হয়ত তোমার খোঁপায় পড়িয়ে দেবে একগুচ্ছ বকুল ফুলের মালা। জীবন তো এরই নাম। ধুকে ধুকে মরার জন্য অপেক্ষা করার নাম জীবন নাকি?
রানু আমাকে বাধা দিয়ে কোমল স্বরে কথা বলতে লাগলো। ওর গলার আওয়াজ যেন হাতের ক’গাছি চুড়ি, রিনরিন শব্দে বেজে চলেছে। ওর কোন কথাই কানে যাচ্ছে না। তাতে কোন ক্ষতি নেই। আমি জানি আমার সময় কতটুকু। আমার এখন খুব ইচ্ছে করছে ওর হাত দুটো ধরে বলি, রানু আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি মরণকে হারাতে পারব, যদি তুমি পাশে থাক। তুমি বুঝতে পারছনা, মরতে আমার খুব ভয়।
তারপর রানু চলে গেল। ওকে কিছু বলিনি। বেরিয়ে যাবার সময়ও নয়। আস্তে করে টেবিল হতে হ্যান্ড ব্যাগটা হাতে নেবার সময়ও নয়। আমাকে যখন শেষ বারের মত জড়িয়ে ধরল, তখনও আমি শান্তই ছিলাম। কিন্তু ও যখন দরজা খুলে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াল, তখন আমার মাথায় কোথাও বিস্ফোরণ ঘটলো। আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। বুক ধড় ফড় করছে। নিশ্বাস নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে।
তারপর আর লেখা নেই। জানালার ধারে বসে রয়েছি। ভাবছি আমি। কতই না বয়স ছিল অভ্রের। ২৭ বা ২৮। এতো অল্প বয়সেই জীবনের অদৃশ্য শিকল ছিঁড়ে ফেলেছে। মিলিয়ে গেছে মহাকালের অতল গর্ভে।
কোথায় এখন রানু?
জানি না। জানতে ইচ্ছেও করছে না। এতটুকু জানি শেষ কটা দিন অভ্র সবাইকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। সাহসী হতে চেয়েছিল। যাতে মৃত্যুকে সে মোকাবেলা করতে পারে। পেরেছিল কি?
এমন সময় ওর মা ঢুকলেন ঘরে। দিন রাত একমাত্র ছেলে হারানর শোকে পাগলপ্রায়। চোখ দুটো লাল টকটকে। সামনের বিছানায় বসলেন। কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে আমার হাতের ডাইরিটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বলতে লাগলেন, বাবা, ডাক্তাররা জবাব দেবার পর থেকে ছেলেটা আমার কেমন যেন হয়ে গেল। চোখ দুটো স্থির, যেন সবসময় কি যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে চাইত, গেথে রাখতে চাইত মনে। কথা খুব কম বলত। বাবা, তুমি তো জানো শেষ কটা দিন চিকিৎসার জন্য আমাদের দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে। রক্ত দেবার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলাম ওকে তখন। স্ট্রেচারে শুয়ে আমার দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটা কি বলেছিল জানো, মাগো ...... জীবন এতো ছোট কেনে, এই ভুবনে। আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে সেই কখন। তাকিয়ে আছি জানালার গরাদ দিয়ে বহু দূরে। আমার কিছুই ভাল লাগছে না। চোখ দুটো সেই কখন থেকে ঝাপসা লাগছে। দূর দূরান্ত থেকে বাড়ি ফিরছে পাখি গুলো। সব পাখিরাই কি শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারে?
কেউ কেউ কি রয়ে যায়না?
আস্তে করে হাতে নিলাম ডায়রিটা। এ বছরেরই। সালটা সোনালি আভায় জ্বলজ্বল করছে। ভেতরের পাতাগুলোতে চোখ বুলালাম। ও তো কখনও আত্মকেন্দ্রিক ছিল না। ডায়রি লেখার মতো সময় সে পাবে কথায়? সারাদিন ক্যাম্পাসে হৈচৈ, গলা মাতিয়ে গানের আসর, বন্ধুদের বাসায় ঢুঁ দেয়া বা লাইব্রেরির সিঁড়িতেই তো রাত নামাত। সেই অন্যান্য ভ্যাবদা ছেলেদের মতো ডাইরি লিখবে, বিশ্বাস করা কঠিন।
তবুও পড়তে লাগলাম। গোঁটা গোঁটা অক্ষরে লেখা, অনেকটা মেয়েলি ধাঁচের, তবে সুন্দর।
শুরুতে কয়েক পৃষ্ঠা কাটাকাটিতে ভরপুর। বোধহয় যা লিখতে চাচ্ছিল তা হচ্ছিল না। তারপর বলা নেই, কওয়া নেই মধ্য পাতা হতে শুরু।
গত কদিন জাবত অস্থির লাগছে। আগে জানালাটার সামনে দাঁড়ালে একটু কমত। এখন আর তা হয় না। বাইরে সবে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে, আবছা আধারে ঢেকে আসছে চারদিক। মেঘের জন্য সূর্যও ঢাকা পরেছে গত কয়েকদিন। এই আবার শুরু হল। চারদিকে তুমুল বৃষ্টি, কানে তালা ধরিয়ে দেবার মতো বিজলি চমকাচ্ছে।
জানি না কার কেমন লাগে, আমার বৃষ্টি ভাল লাগে। ভাল লাগে দু হাত দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতে। আর ভাল লাগে রানুকে। আর আমার ভাল লাগা কতোটা ক্ষণস্থায়ী, সেটা আমি জানি। জানি বলেই আমার মনটা আজ বিক্ষিপ্ত। কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা। আজ-
তারপর আবার কাটাকুটি। কি যেন লিখবে লিখবে করেও লিখতে পারছে না। আমি আবার কয়েকটা পাতা এগিয়ে যাই। আবার হঠাৎ শুরু-
আজ এসেছিল রানু। ওর কথা আগে ভাবলেই বুকের কোথাও যন্ত্রণা করে উঠত। এবার কেন যেন তা হয় নি। এসে বসেছিল ওই জানালার ধারে। দৃষ্টিতে কেন যেন সেই ছেলেমানুষি ছিল না। আমি ওর পাশে এশে বসলাম। ওর নিশ্বাসের শব্দ এতো তীব্র ভাবে পাচ্ছিলাম, মনে হয়েছিলো আমার শরীর বরফ শীতল হয়ে যাচ্ছে। আমি যেন এই জগতে নেই। ও ওর লম্বা চুলগুলো আজ খোঁপায় বাধে নি। একরাশ কাল মেঘের মতো মাথা এলিয়ে পড়ে আছে কোমর অবধি। রানু চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। আমার তখন মনে হয়েছিলো ওর কোমল চুলগুলোকে ছুয়ে দেখি। হাতদুটো ধরে বসে থাকি।
কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নেই। বিধাতা আমার সকল ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন অজানা অচেনা কোন এক কঠিন সত্যের জালে। যা হতে আমার নিস্তার নেই।
রানু আস্তে করে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল, কপাল হতে কয়েকটি চুল সরিয়ে বলল, অভ্র...আমি-
রানু কি বলবে আমি জানি। আর তাই চোখ তুলে চেয়ে চুপ করে রইলাম। রানুর চোখে দু ফোঁটা অশ্রু টলমল করছে। এই পরবে, ওই পরল অবস্থা। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলাম। দু টুকরো হীরে যেন। রানু যেন নিজেকে কোন ভাবে স্থির রেখে বলতে লাগলো, অভ্র আমাদের আর দেখা হবে না তাই না।
আমার একটি হৃদস্পন্দন যেন হারিয়ে গেল। খুব সাবধানে নিঃশ্বাস চেপে বললাম, না, আমাদের আর দেখা হবে না।
রানু ফুপিয়ে উঠল। ও ঠিকই বুঝতে পারছিল আমি কি চাই?
রানুর চোখ হতে দু ফোঁটা পানি আর নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারল না। ঝরে পরল ওর কোলে। ধীরে ধীরে হতাশায় কালো হতে শুরু করেছে ওর সুন্দর মুখখানি। কাধ দুটো নুয়ে পরেছে। আস্তে আস্তে চোখের পানি মুছে বলল,
কেন অভ্র? আমাদের সাথেই কেন হবে? আমরা তো কোন পাপ করিনি। তবুও- আর বলতে পারল না। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। টেবিলের কোনায় মাথা রেখে কাঁদতে লাগলো।
আমার তখন চীৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, রানু কেঁদো না। আমি কখনও তোমাকে একা ছাড়বো না। এই দেখ, কথা দিচ্ছি। আমি সকল বাধা জয় করবই। আমি মরব না। দেখ আমি বেঁচে থাকব। তোমার স্পর্শই আমাকে মৃত্যুর মুখ হতে ফিরিয়ে আনবে। দেখ, আমি কথা দিচ্ছি।
কিন্তু, পারলাম না। রানুকে বলতে পারলাম না। পারলাম না ওকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিতে। খুব স্বাভাবিক গলায় ওর সাথে কথা বলেছি। ওকে বলেছি, জীবন কোন ঝরা পাতার নাম নয়। জীবন এক অবিরাম ভালবাসার সঙ্গীত, গেয়ে যেতে হবে। আজ আমার পালা শেষ, কাল তোমার আসবে। তাই মিছে ভেবো না। আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি চাই নিজের জীবনকে তুমি তোমার পথে এগিয়ে নেবে। একদিন আমার মতই তোমার পথ কেউ রোধ করে দারিয়ে বলবে, রানু- তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর, যেন কোন কাজল জলের দীঘি। হয়ত তোমার খোঁপায় পড়িয়ে দেবে একগুচ্ছ বকুল ফুলের মালা। জীবন তো এরই নাম। ধুকে ধুকে মরার জন্য অপেক্ষা করার নাম জীবন নাকি?
রানু আমাকে বাধা দিয়ে কোমল স্বরে কথা বলতে লাগলো। ওর গলার আওয়াজ যেন হাতের ক’গাছি চুড়ি, রিনরিন শব্দে বেজে চলেছে। ওর কোন কথাই কানে যাচ্ছে না। তাতে কোন ক্ষতি নেই। আমি জানি আমার সময় কতটুকু। আমার এখন খুব ইচ্ছে করছে ওর হাত দুটো ধরে বলি, রানু আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি মরণকে হারাতে পারব, যদি তুমি পাশে থাক। তুমি বুঝতে পারছনা, মরতে আমার খুব ভয়।
তারপর রানু চলে গেল। ওকে কিছু বলিনি। বেরিয়ে যাবার সময়ও নয়। আস্তে করে টেবিল হতে হ্যান্ড ব্যাগটা হাতে নেবার সময়ও নয়। আমাকে যখন শেষ বারের মত জড়িয়ে ধরল, তখনও আমি শান্তই ছিলাম। কিন্তু ও যখন দরজা খুলে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াল, তখন আমার মাথায় কোথাও বিস্ফোরণ ঘটলো। আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। বুক ধড় ফড় করছে। নিশ্বাস নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে।
তারপর আর লেখা নেই। জানালার ধারে বসে রয়েছি। ভাবছি আমি। কতই না বয়স ছিল অভ্রের। ২৭ বা ২৮। এতো অল্প বয়সেই জীবনের অদৃশ্য শিকল ছিঁড়ে ফেলেছে। মিলিয়ে গেছে মহাকালের অতল গর্ভে।
কোথায় এখন রানু?
জানি না। জানতে ইচ্ছেও করছে না। এতটুকু জানি শেষ কটা দিন অভ্র সবাইকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। সাহসী হতে চেয়েছিল। যাতে মৃত্যুকে সে মোকাবেলা করতে পারে। পেরেছিল কি?
এমন সময় ওর মা ঢুকলেন ঘরে। দিন রাত একমাত্র ছেলে হারানর শোকে পাগলপ্রায়। চোখ দুটো লাল টকটকে। সামনের বিছানায় বসলেন। কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে আমার হাতের ডাইরিটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বলতে লাগলেন, বাবা, ডাক্তাররা জবাব দেবার পর থেকে ছেলেটা আমার কেমন যেন হয়ে গেল। চোখ দুটো স্থির, যেন সবসময় কি যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে চাইত, গেথে রাখতে চাইত মনে। কথা খুব কম বলত। বাবা, তুমি তো জানো শেষ কটা দিন চিকিৎসার জন্য আমাদের দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে। রক্ত দেবার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলাম ওকে তখন। স্ট্রেচারে শুয়ে আমার দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটা কি বলেছিল জানো, মাগো ...... জীবন এতো ছোট কেনে, এই ভুবনে। আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে সেই কখন। তাকিয়ে আছি জানালার গরাদ দিয়ে বহু দূরে। আমার কিছুই ভাল লাগছে না। চোখ দুটো সেই কখন থেকে ঝাপসা লাগছে। দূর দূরান্ত থেকে বাড়ি ফিরছে পাখি গুলো। সব পাখিরাই কি শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারে?
কেউ কেউ কি রয়ে যায়না?